# Tags

ঠাকুরগাঁওয়ে সার বরাদ্দে ‘কমিশন বাণিজ্য’ কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ

মাসুদ রানা পলক, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধিঃ সরকারের নির্ধারিত নীতিমালা উপেক্ষা করে অর্থের বিনিময়ে রাসায়নিক সার বরাদ্দ, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগে ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার বিসিআইসি ও বিএডিসির রাসায়নিক সার ডিলারদের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয় কৃষি মন্ত্রণালয়।
উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আক্তারুন্নাহার।
এর ধারাবাহিকতায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুল রহিম স্বাক্ষরিত এক আদেশে রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সিরাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, দিনাজপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ এবং পঞ্চগড় জেলার উপপরিচালকের কার্যালয়ের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সুবোধ চন্দ্র রায়। গঠিত কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে গত ২৫ মার্চ রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রাসায়নিক সারের বস্তা প্রতি কমিশনের বিনিময়ে অস্বাভাবিকভাবে বরাদ্দপত্র প্রদান, অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত কমিটি গত সোমবার (৬ এপ্রিল) ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কার্যালয়ে গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার কথা থাকলেও রোববার (১২ এপ্রিল) তদন্ত কমিটির সদস্যরা কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সারাদিন বিভিন্ন কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন বলে জানা গেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দেওয়া ঠাকুরগাঁও জেলার বিসিআইসি ও বিএডিসির রাসায়নিক সার ডিলারদের লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম (পরিচিতি নং-২০৪২) ঠাকুরগাঁওয়ে উপপরিচালক হিসেবে যোগদানের পর অনৈতিকভাবে সেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। গত বছরের ৩০ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও জেলার জন্য ১২০০ মেট্রিক টন টিএসপি সার বরাদ্দ আসে। কিন্তু মো. মাজেদুল ইসলাম নিজের সেচ্ছাচারিতা ও কতিপয় ডিলারগনকে বা প্রতি রেশিয় হিসেবে লভ্যাংশর বিমিময়ে ২ ডিসেম্বর অস্বাভাবিকভাবে ৮০৫ মেট্রিক টন টিএসপি সার বরাদ্দপত্র ইস্যু করেন এবং ৩৯৫ মেট্রিক টন টিএসপি সার বিপুল অর্থের বিনিময়ে পছন্দের ডিলারদের বরাদ্দ দেয়ার জন্য গোপন রাখেন।
এরমধ্যে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় ২৮৫, পীরগঞ্জ উপজেলায় ১২৫, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় ২৩৫, রানীশংকৈল উপজেলায় ১০০, হরিপুর উপজেলায় ৬০ মেট্রিক টন সার ৬৬ জন ডিলারকে নিয়ম অনুযায়ী বন্টন করার কথা থাকলেও ঘুষ বিনিময়ে কাউকে কাউকে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ায় গোপন তথ্য বেড়িয়ে আসে এবং ৩৯৫ মেট্রিক টন টিএসপি সার লুকিয়ে রেখে কৃষকের মাঝে সংকট সৃষ্টি করান অভিযুক্ত উপপরিচালক মাজেদুল।
পরবর্তীতে টিএসপি সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে জেলার কৃষকদের মধ্যে সার বিতরণ নিয়ে আতংক সৃষ্টি করেন তিনি। জেলার বালিয়াডাঙ্গী রানীশংকৈল উপজেলা আবাদী জমির পরিমাণ অনেক বেশি। কিন্তু উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম অর্থের বিনিময়ে কোনো নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় ২৩৫ মেট্রিক টন ও রানীশংকৈল উপজেলায় ১০০ মেট্রিক টন টিএসপি সার বরাদ্দ দেন। কিন্তু তার এই অনিয়মের কথা কোনো কর্মকর্তা বলতে গেলে তাকে বদলিসহ বিভিন্নভাবে প্রশাসনিক ক্ষতার অপব্যবহারের মাধ্যমে হয়রানিসহ ভয়ভিতি দেখান এবং রংপুর মহানগরীর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামুর ভাতিজা পরিচয়ে প্রভাব দেখান।
২ ডিসেম্বর সার বিরতণের অনিয়মের কারণে রানীশংকৈল উপজেলার উমরাডাঙ্গী বাজারে সার বিতরণ পয়েন্টে মো. আকতারুল ইসলাম নামে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে বেধরক মারপিট করেন। এ সময় তার ৫টি দাত ভেঙে দেন ক্ষিপ্ত জনতা।
পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কর্মকর্তার অসুস্থতার খোঁজ না নিয়ে বা তদন্ত না করে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের না জানিয়ে উল্টো আকতারুল ইসলামকে শোকজ করা হয়। পরবর্তীতে ৩ ডিসেম্বর দিনাজপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শারীরিকভাবে লাঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কেন অবগত করা হয়নি তার ব্যাখ্যা লিখিতভাবে চাওয়া হয় মো. মাজেদুল ইসলামের কাছে।
আরও জানা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রণোদনা ও পূর্নবাসন কর্মসূচির আওতায় সরকারকৃর্তক প্রদত্ত অর্থ দিয়ে গুনগত মানসম্পন্ন বীজ ক্রয় না করে নিম্নমানের বীজ ক্রয় করে উপজেলা কৃষি অফিসে সরবরাহ করেন। বর্তমানে ওই বীজ দিয়ে জেলায় কোনো পেয়াজ উৎপাদন হয় নাই। বরং প্যাকেটে পেয়াজ বীজের পরিবর্তে ঘাসের বীজ দেওয়া হয়েছে।
ডিলার সংশ্লিস্টরা অভিযোগ করে বলেন, যেখানে সার সংকট দূর করার কথা সেখানে সংকট তৈরি করেন উপপরিচালক মাজেদুল। এ ধরনের কর্মকর্তার কারণে দেশের পরিস্থিতিও অস্বাভাবিক হয়ে উঠে। টাকার জন্য তারা সবকিছুই করতে পারেন। তদন্ত করে এ ধরনের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তি প্রদান করা প্রয়োজন বলেন মানে করেন তারা।
অভিযোগ প্রসঙ্গে উপপরিচালক মো. মাজেদুল ইসলাম জানান, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। যেহেতু তদন্ত হচ্ছে, অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেড়িয়ে আসবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সঠিক তথ্য উদঘাটনে তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত শেষে দ্রুতই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।